মুন্সীগঞ্জে প্রধানমন্ত্রী‘আমেরিকার হুমকি ছিল’


পদ্মা সেতুর ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে, যা খুবই গৌরবের বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, ড. ইউনুসের কারণে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করেনি বিশ্বব্যাংক।
তিনি বলেছেন, জনগণের আস্থায় নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু হচ্ছে।
রবিবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় গোলচত্বরে সুধীসমাবেশের ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, প্রথমে পদ্মা সেতুর কাজ আমি শুরু করেছিলাম। কিন্তু, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে কাজ বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ফের ক্ষমতায় এসে কাজ শুরু করি।
তিনি বলেন, নিচে রেল ও ওপরে সেতু- এমন একটি ডিজাইন তিনি অনুমোদন করেন। তখন বিশ্বব্যাংকসহ অনেকে এগিয়ে এসেছিল কাজটি করার জন্য। কিন্তু দেশের কিছু মানুষ আছে, যারা দেশের স্বার্থ দেখেন না।
পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ দুই বছর পিছিয়ে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বেআইনিভাবে ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি ছিলেন। আইনি লড়াইয়ে তিনি যখন এমডি থাকতে পারছেন না তখন আমার কাছে আমেরিকার বিভিন্ন অ্যাম্বাসেডর আসতেন। তারা হুমকি দিতেন যে, ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে সরালে পদ্মা সেতু হবে না।’
‘পদ্মাসেতুর অর্থায়ন বন্ধ করেছে ড. ইউনূস। কোনো মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম থাকলে কেউ দেশের এত বড় সর্বনাশ করতে পারে? সুদের টাকায় যিনি ধনী হতে পারেন তার ভেতর দেশপ্রেম থাকবে না এটিই স্বাভাবিক।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৯৬ সালে আমরা যখন ক্ষমতায় আসি তখন মোবাইল খাতকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিই। ওই সময় ড. ইউনূস এসে আমার কাছে বললেন, তাকে একটা ফোন দিলে তিনি ব্যবসা করতে চান। তিনি বললেন, এই ফোন কোম্পানি থেকে লাভের টাকা গ্রামীণ ব্যাংকে যাবে এবং এই টাকায় দরিদ্র মানুষেরা উপকার পাবেন। আমরা তিনটা কোম্পানিকে ফোন দিই, ড. ইউনূসকে দিলাম গ্রামীণ ফোন। কিন্তু এই ফোনের লভ্যাংশের একটা টাকাও গ্রামীণ ব্যাংক পাইনি।’
বেআইনিভাবে ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি ছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আইনে আছে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত যে কেউ এমডি থাকতে পারবেন। ৭০ পেরিয়ে যাচ্ছে তখনও ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি। এই ব্যাংকটা সরকারি পয়সায় করা। ৯৮ সালের বন্যায় এই ব্যাংকটি খুব বিপদে পড়ে। আমরা গ্রামীণ ব্যাংককে ৪০০ কোটি টাকা দিয়েছিলাম। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য ৭০ বছর বয়সেও তিনি এমডি। কোনো অনুমোদন ছাড়াই তিনি এমডির পদ দখল করে থাকলেন। প্রতিমাসে সরকারি বেতনও নেন। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ড. ইউনূসকে চিঠি দিয়ে বলা হলো, আপনি বেআইনিভাবে এমডি পদে থাকতে পারবেন না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ড. ইউনূসকে অসম্মান করতে চাইনি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী দেখা করলেন। তারা প্রস্তাব দিলেন, আপনি এমডি পদ থেকে সরে যান। আমরা আপনাকে গ্রামীণ ব্যাংকের ইমেরিটাস উপদেষ্টা করে রাখব। ড. ইউনূস এ প্রস্তাব মানলেন না। তিনি মামলা করে দিলেন।’
‘একটা মামলা হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে। আরেকটা মামলা হলো অর্থমন্ত্রীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। কিন্তু মামলায় ড. ইউনূস হেরে গেলেন। ড. ইউনূস যে ১০ বছর অতিরিক্ত বেতন নিয়েছেন কোর্ট চাইলে তা ফেরত নিতে পারত। কিন্তু আমাদের দিক থেকে কোনো দাবি ছিল না। কোর্ট ড. ইউনূসকে বলে দিল, আপনি থাকতে পারেন না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ড. ইউনূস ক্ষেপে গেলেন। হিলারি ক্লিনটন ওইসময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আমাকে ফোন করলেন, ড. ইউনূসকে যেন গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি হিসেবে রাখি। আমি বললাম, আইনে এটা নেই। আমি কী করে রাখব? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার তার স্ত্রী শেরি ব্লেয়ার আমাকে ফোন করলেন। এভাবে আরও অনেকেই। কিন্তু এটি তো আইনে পড়ে না। আইনের বাইরে আমরা কী করব? তাছাড়া আইন সংশোধন করব? সেই প্রস্তাবও তো আমাদের কেউ দেয়নি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ড. ইউনূস মামলায় হেরে যাওয়ার পর অনেকেই আমার কাছে আসতেন। অনেক সময় আমেরিকান অ্যাম্বাসেডর যারা আছেন তারা এসেও হুমকি দিতেন, ইউনূসকে এমডি পদ থেকে সরালে পদ্মাসেতু হবে না। অনেক দিক থেকে হুমকি ছিল।’
‘কিন্তু আমার প্রশ্ন নোবেল প্রাইজ যিনি পেয়েছেন তিনি কেন ব্যাংকের এমডির পদ ছাড়তে পারেন না। সেই জায়গায় এত লোভ কেন’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এরপর আমাদের পত্রিকার স্বনামধন্য এক এডিটর ও ইউনূস হিলারির সঙ্গে দেখা করলেন। হিলারি সব কথা শুনে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রধানকে বলে দেন যেন পদ্মাসেতু নির্মাণে বাংলাদেশকে কোনো টাকা দেওয়া না হয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এই টাকা বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পেছনে ছিল ড. ইউনূস’।
তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে বলা হলো, পদ্মাসেতুতে দুর্নীতি হয়েছে। তাদের একজন ইন্টেগ্রিটি অফিসার যিনি একজন ব্রিটিশ। বাংলাদেশে এসে এখানে- সেখানে বলে বেড়ালেন, পদ্মাসেতুতে দুর্নীতি হয়েছে। বাংলাদেশে এমন একজন দুর্নীতিবাজ আছেন যা পা থেকে মাথা পর্যন্ত দুর্নীতি রয়েছে। তিনি হলেন শেখ হাসিনা।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ড. মশিউর রহমান ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে চিঠি পাঠালেন। আমরা জানতে চাইলাম, কোথায় দুর্নীতি হয়েছে তা জানতে চাই। তারা কিছু কাগজ নিয়ে এলো। ২০০১-০৬ পর্যন্ত। আমি বললাম এরা আমার মন্ত্রী না। পদ্মাসেতুর কোথায় দুর্নীতি হয়েছে আপনারা সেটা দেখান। তারা দেখাতে পারলেন না।’
‘আমরা চিন্তা করলাম পদ্মাসেতু নিজেদের অর্থায়নে করব। কারও সাহায্য নেব না। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশের মানুষের প্রতি। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই সকলের কাছ থেকে। আমি সাহস পেলাম।’
‘এরপরও বলা হলো পদ্মাসেতুর টাকা দেব উপদেষ্টাকে বের করতে হবে, মন্ত্রীকে বের করতে হবে। আমি বললাম, নো। আপনারা প্রমাণ না দিলে আমি কিছুই করব না।’
সেই সময় মালয়েশিয়া বিনিয়োগ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন আপনারা করেন, সহায়তা লাগলে আমরা করব। তারা একটা প্রজেক্ট ফাইলও করেছিল। যাই হোক, আমরা নিজেদের অর্থায়নে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করেছি।’
‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, কেউ দাবায়ে রাখতে পারব না। এটাই আমরা প্রমাণ করেছি। পদ্মাসেতু নির্মাণ কাজ শুরু করে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি আমরা পারি। আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না’ বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
উল্লেখ্য, পদ্মা সেতুর কর্মযজ্ঞ পরিদর্শন করতে আজ রবিবার (১৪ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১০টায় ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে রওয়ানা দিয়ে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন (মাওয়া প্রান্ত) করেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে পদ্মাসেতুর নামফলক উম্মোচন (মাওয়া প্রান্ত) এবং মূল নদীশাসন কাজ সংলগ্ন স্থায়ী নদী তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজেরও উদ্বোধন করেছেন তিনি।

No comments

Powered by Blogger.