তারেক রহমানের ঐতিহাসিক রাজকীয় প্রত্যাবর্তন।
সিফাত বিন সিদ্দিক স্টাফ রিপোর্টার:
প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের জনসমুদ্রে ১৭ বছর পর তারেখ রহমানের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন: নতুন দিনের ‘প্ল্যান’ নিয়ে শুরু নতুন যাত্রা
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে আজ এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে প্রিয় মাতৃভূমিতে পা রাখলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেখ রহমান। ২০০৮ সালে দেশত্যাগের পর দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে তার এই ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে আজ রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে রাজধানীর প্রতিটি অলিগলি আজ ছিল লোকে লোকারণ্য, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এদিন জনাব তারেখ রহমানকে একনজর দেখার জন্য ঢাকার রাজপথে নামে মানুষের ঢল। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিমানবন্দর ও তৎসংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু করে ৩০০ ফিট পর্যন্ত প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের বিশাল সমাবেশ ঘটে। মানুষের এই বাঁধভাঙা জোয়ারের কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট সংবর্ধনা অনুষ্ঠানস্থল পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে তার সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। রাস্তার দুই পাশে অপেক্ষমাণ লাখো মানুষের ভালোবাসা ও স্লোগানে সিক্ত হয়ে ধীরগতিতে এগোতে থাকে তার গাড়ি বহর। পুরো রাস্তা তারেক রহমান হাত নাড়িয়ে অভিবাদন গ্রহন করেন।
পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে জনাব তারেখ রহমান দেশ নিয়ে তার সুদূরপ্রসারী ভাবনার কথা জানান। সমবেত বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের কথা উল্লেখ করে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, "আই হ্যাভ আ প্ল্যান" (I have a Plan)। তিনি স্পষ্ট করেন যে, তার কাছে দেশ গড়ার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা রয়েছে, যা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয় বরং সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা এবং একটি বৈষম্যহীন ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রণীত। তিনি এই ভাষণে একাত্তর,নব্বই ও চব্বিশ সহ সকল আন্দোলন সংগ্রামে নিহত শহিদদের সরণ করেন। তিনি শহিদ ওসমান হাদির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি সকল রাজনৈতিক দলের মানুষ, সকল ধর্মের মানুষ, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সাথে নিয়ে একটি বাংলাদেশ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।তার এই বলিষ্ঠ ঘোষণা উপস্থিত কোটি মানুষের হৃদয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার করে।
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাঁর গভীর আনুগত্য ও ধর্মীয় আদর্শের প্রতিফলন। জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমেই মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে লাখো শুকরিয়া আদায় করে বলেন, আল্লাহর অশেষ রহমত এবং মানুষের দোয়ার বরকতে তিনি আজ সুস্থভাবে দেশে ফিরতে পেরেছেন। তিনি পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন যে, "আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন।" তাঁর সকল কাজ ও পরিকল্পনায় মহান আল্লাহর রহমত ও সাহায্য কামনা করে তিনি এক আবেগঘন মোনাজাত পরিচালনা করেন।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, জনাব তারেক রহমান তাঁর ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসবে, তারা সকলে মিলে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো ন্যায়পরায়ণতার (Justice) আদর্শে এই দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তিনি একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুশাসনের মডেলকে অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন।
সংক্ষিপ্ত এই অনুষ্ঠান শেষ করেই জনাব তারেখ রহমান কোনো বিশ্রাম ছাড়াই সরাসরি ছুটে যান রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর দেশের মাটিতে তিনি তার অসুস্থ মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর মা ও ছেলের এই পুনর্মিলন এক অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি করে। হাসপাতালের কেবিনে মায়ের শয্যাপাশে বসে তিনি বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটান এবং তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। মায়ের প্রতি তার এই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা উপস্থিত চিকিৎসক ও দলীয় নেতাকর্মীদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনাব তারেখ রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কেবল বিএনপির জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়ার এক শক্তিশালী ইঙ্গিত। দীর্ঘ ১৭ বছরের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাকে বরণ করে নিতে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে দেশের মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা। তার ঘোষিত "প্ল্যান" এবং প্রতিহিংসামুক্ত দেশ গড়ার আহ্বান আগামী দিনের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


No comments