বিজয়ের ৫৪ বছর: আধিপত্যবাদ ও স্বৈরাচারের গ্রাস থেকে সার্বভৌমত্বের নবজাগরণ।

 


সিফাত বিন সিদ্দিক স্টাফ রিপোর্টার : 
বিজয়ের ৫৪ বছর। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানচিত্রে যে স্বাধীন ভূখণ্ডের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তার পেছনে ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের এক আকাশসমান স্বপ্ন। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা থাকলেও, ক্ষমতা কুক্ষিগত করার আকাঙ্ক্ষা তাকে জনবিচ্ছিন্ন করে তোলে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, রক্ষীবাহিনীর ত্রাস এবং সবশেষে বহুদলীয় গণতন্ত্র হরণ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বা ‘বাকশাল’ কায়েম—এ সবই ছিল সদ্য স্বাধীন দেশের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবের নির্মম হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিয়োগান্তক ঘটনাই ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের এক অনিবার্য পরিণতি।
​পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ এক নতুন দিশা পায়। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর উন্মেষ ঘটিয়ে তিনি দেশকে ভারতের ছায়ামুক্ত করে একটি স্বতন্ত্র ও আত্মমর্যাদাশীল পরিচয় এনে দেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন এবং বদ্ধ অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে তিনি আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।তবে ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখল এবং দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক শাসন গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে আবারও ব্যাহত করে। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এরপর খালেদা জিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও দেশে সীমাহীন দুর্নীতি আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও ২০০১ সালে পুনরায় ক্ষমতার মসনদে বসলেও দুর্নীতি দমন করতে সক্ষম হয় নি।এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে ১/১১-এর পটপরিবর্তন ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। মাইনাস টু ফর্মুলা এবং বিরাজনীতিকরণের সেই প্রক্রিয়ার পথ ধরেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে এক বিশেষ দেশি-বিদেশি সমঝোতার ‘ব্লু-প্রিন্ট’ বাস্তবায়ন করা হয়, যার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়। তথাকথিত ‘বিপুল জনসমর্থন’র আড়ালে সেটি ছিল মূলত দীর্ঘমেয়াদী ফ্যাসিবাদের গোড়াপত্তন।
​২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের তমসাচ্ছন্ন এক অধ্যায়। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় পিলখানায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ছিল সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এবং নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার গভীর ষড়যন্ত্র, যেখানে খোদ সরকারের শীর্ষ মহলের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জনমনে প্রবল সন্দেহ ও ক্ষোভ আজও বিদ্যমান। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের নিরীহ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ ও আলেমদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। নিহিত হয় অসংখ্য মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ।আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে 'আয়না ঘরে' বন্দি করা হয়।২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে হাসিনা সরকার যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে অনেক বিশিষ্ট আলেম ও ব্যক্তিকে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দেয়। 
আবার অনেককে কারাগারে আবদ্ধ রেখে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে।২০১৮ সালে নির্বাচনে আগেই প্রধান সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে কারাগারে পাঠিয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার। বিগত পনেরো বছরে বাংলাদেশ কার্যত ভারতীয় আধিপত্যবাদের একটি করদ রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। ‘দিল্লির স্বার্থ রক্ষা’ই হয়ে দাঁড়িয়েছিল পররাষ্ট্রনীতির মূল মন্ত্র, যার বিনিময়ে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছিল তিস্তার পানি থেকে শুরু করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব। উন্নয়নের জিকির তুলে ব্যাংক লুটপাট, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার এবং ‘আয়নাঘর’ তৈরি করে ভিন্নমত দমনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন এক মূর্তমান স্বৈরাচারী ও খুনি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।
​কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতা প্রমাণ করেছে, বন্দুকের নলে ক্ষমতা সাময়িকভাবে টিকে থাকলেও চিরস্থায়ী হয় না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র যুদ্ধ। শত শত শহীদের রক্তের বন্যায় ভেসে গিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ঠিক সেই দেশেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। স্বৈরাচারের এই পলায়ন প্রমাণ করে, এ দেশের মাটির সাথে তাদের কোনো আত্মিক সম্পর্ক ছিল না। বিপ্লব-পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত দেড় বছরে ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্রকে টেনে তুলেছে। বিচার বিভাগ, পুলিশ ও প্রশাসনের আমূল সংস্কার এবং লুণ্ঠিত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তাদের ভূমিকা আজ দৃশ্যমান।
​আজ ২০২৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ গর্ব করে বলতে পারে, আমরা এখন আর কারো করুণার পাত্র নই। ৫৪ বছরের পথচলায় আমাদের অর্জন কম নয়—তৈরি পোশাক শিল্পে বিশ্বনেতৃত্ব, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ঘামে ভেজা শক্তিশালী রিজার্ভ, কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে বিপ্লব এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের সেনাবাহিনীর ঈর্ষণীয় সাফল্য বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে এক প্রভাবশালী রাষ্ট্রের মর্যাদায় আসীন করেছে। কিন্তু এবারের বিজয় দিবসের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ‘ভয়হীনতা’ এবং ‘সার্বভৌমত্ব’। ২০২৪-এর বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হয়। ৫৪ বছর পর আজ সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ ভারতীয় বা অন্য কোনো বিদেশি আধিপত্যমুক্ত হয়ে, নিজস্ব স্বকীয়তা ও অদম্য শক্তি নিয়ে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।


2 comments:

  1. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  2. আমি আমার জীবনে এখন পর্যন্ত বিজয় দিবসের উপর এমন কোনো আর্টিকেল পড়িনি। লেখালেখি বন্ধ করবি না ভাই। দোয়া থাকবে সবসময়।

    ReplyDelete

Powered by Blogger.