সার্বভৌমত্বের কণ্ঠস্বর ওসমান হাদির চিরবিদায়: জনসমুদ্রে জানাজা শেষে নজরুলের পাশেই সমাহিত

 সিফাত বিন সিদ্দিক ​:  রাজধানীর আকাশ আজ যেন এক গুমোট শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছিল। যে সংসদ ভবনের প্রাঙ্গণ থেকে একসময় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার বজ্রকণ্ঠ শোনা যেত, সেই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আজ অনুষ্ঠিত হলো এ প্রজন্মের নির্ভীক কলম সৈনিক ও দেশপ্রেমিক নেতা ওসমান হাদির জানাজা। গত বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুরের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সারা দেশে এক গভীর শূন্যতা ও শোকের আবহ বিরাজ করছে।

এর আগে গত ১২ই ডিসেম্বর তাকে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তিনি গুরুতর আহত হন।তিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হন৷ তার দেশেই চিকিৎসা চলমান ছিল। কিন্তু তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। সেখানেই তিনি গত ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত পোনে নয়টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ যোদ্ধা। তিনি সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেছেন। তিনি সবসময় ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের মাঝে কত জনপ্রিয় ছিলেন তা বোঝা যায় তার জানাজায়। ​আজ শনিবার বাদ জোহর অনুষ্ঠিত এই জানাজা রূপ নিয়েছিল এক বিশাল জনসমুদ্রে। সংসদ ভবনের সীমানা পেরিয়ে মানুষের সারি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং ফার্মগেট এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই শোকাতুর সমাবেশে অংশ নেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জানাজা শেষে কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি বলেন, ওসমান হাদি ছিলেন এ দেশের মানচিত্র ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী, যার অভাব পূরণ হবার নয়।এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা এবং দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সর্বস্তরের মানুষের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, দল-মত নির্বিশেষে ওসমান হাদি ছিলেন দেশের মানুষের আস্থার এক অবিসংবাদিত নাম।

জানাজা শেষে এক আবেগঘন পরিবেশে তার মরদেহবাহী গাড়িটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। রাজপথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার তরুণ ও সাধারণ মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে প্রিয় নেতাকে বিদায় জানান। রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত এবং পরিবারের সম্মতিতে এই বীর সন্তানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মাজার সংলগ্ন স্থানে সমাহিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আজ বিকেলেই পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবির সমাধির পাশেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে। দেশের মাটি ও মানুষের অধিকার নিয়ে আজীবন লড়াই করা এই মানুষটি কবির সেই বিখ্যাত 'মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই' পঙক্তির মতোই পবিত্র আযানের ধ্বনির সান্নিধ্যে শেষ ঠিকানা খুঁজে পেলেন। তার এই বিদায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এক বিশাল অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।



 

No comments

Powered by Blogger.