নির্বাচনী সমীকরণ: বড় দলের ছায়াতলে ছোট দল, নেপথ্যে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
সিফাত বিন সিদ্দিক স্টাফ রিপোর্টার:বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে মেরুকরণের প্রবল হাওয়া। গত ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনকে ঘিরে দলগুলোর মধ্যে একদিকে যেমন জোট গঠনের তোড়জোড় চলছে, অন্যদিকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ছোট দলগুলোর বড় দলের সাথে একীভূত হওয়া বা জোট বদল রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু ছোট রাজনৈতিক দল তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় কার্যত বিলীন করে দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পতাকাতলে আশ্রয় নিচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে অনেক ক্ষুদ্র দলের শীর্ষ নেতারা তাদের দল বিলুপ্ত করে সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। যেমন—বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা সম্প্রতি নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এ ছাড়া গণ অধিকার পরিষদের একাংশের নেতা রাশেদ খানও আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এককভাবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সামর্থ্য না থাকায় এবং বড় প্রতীকের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতেই এই কৌশল বেছে নেওয়া হচ্ছে।রাজনীতির ময়দানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ও নাটকীয় পরিবর্তন ঘটছে জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্র করে। জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট নিয়ে গঠিত নতুন ধারার দলগুলোর মধ্যে যে ‘তৃতীয় শক্তির’ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, সেখানে এখন বড় ধরনের ফাটল। বিশেষ করে এবি পার্টি (আমার বাংলাদেশ পার্টি) এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি থেকে উদ্ভূত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মিলে শুরুতে যে জোটের আবহ তৈরি করেছিল, তা এখন কার্যত খণ্ডিত। আজ রোববার (২৮ ডিসেম্বর ২০২৫) জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, এনসিপি এবং এলডিপি তাদের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে, যা এখন ১০ দলীয় জোটে পরিণত হয়েছে।এনসিপির এই পদক্ষেপ দলটির অভ্যন্তরে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। জামায়াতের সাথে এই জোটবদ্ধ হওয়ার প্রতিবাদে দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা, বিশেষ করে নারী নেত্রীরা পদত্যাগ করছেন। পদত্যাগকারী নেতাদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। অন্যদিকে, এনসিপি নেতৃত্ব জামায়াতের কাছে ৩০ থেকে ৫০টি আসনের দাবি জানিয়েছে বলে জানা গেছে। মূলত বিএনপির সাথে আসন সমঝোতায় সুবিধা করতে না পেরেই এনসিপির একাংশ এখন জামায়াতের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোর সাথে যুক্ত হয়ে নির্বাচনে নিজেদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে চাইছে।
সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একটি পরিষ্কার দ্বিমুখী স্রোতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে বিএনপি তাদের বৃহৎ মোর্চাকে আরও শক্তিশালী করছে, যেখানে ছোট দলগুলো বিলীন হয়ে একক প্রতীকের শক্তি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে এনসিপি ও সমমনা দলগুলোর নতুন মেরুকরণ রাজপথে একটি শক্তিশালী ‘বিকল্প ব্লক’ তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই জোট ভাঙাগড়ার খেলায় ছোট দলগুলো তাদের আদর্শিক স্বতন্ত্রতা কতটা ধরে রাখতে পারবে, তা এখন বড় প্রশ্ন।

No comments