অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে ঝিনাইদহের ২১ প্রত্নতত্ব স্থাপনা; গেজেটভুক্ত হওয়া সত্বেও হয়নি সংরক্ষণ

 



ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহের ইতিহাস মানেই শুধু অতীত নয়-এটি এই জনপদের আত্মপরিচয়। সময়ের স্রোতে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিনাইদহের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক ও হেরিটেজ স্থাপনাগুলো আজ চরম অবহেলার শিকার। অযতœ,অপরিকল্পিত ব্যবহারে ক্ষয় আর যথাযথ সংরক্ষণ ও তদারকির অভাবে জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গর্ব বহনকারী জেলার ৬ উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা ২১টি হেরিটেজ স্থাপনাই এখন অস্তিত্ব সংকটে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা,দ্রæত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অমূল্য এসব স্থাপনার গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে খুঁজতে হবে কেবল ইতিহাসের বইয়ের পাতায়

নীলকুঠি থেকে রাজবাড়ি-সবখানেই অবহেলার ছাপ:জেলার মহেশপুর উপজেলার খালিশপুরে অবস্থিত ১৯ শতকে নির্মিত প্রাচীন নীলকুঠি ভবনটি এক সময় ঔপনিবেশিক শাসনামলের সাক্ষী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন ছিল। ২০১২ সালের ১৪ জুন প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরের গেজেটে তালিকাভুক্ত হলেও বাস্তবে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণে নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ। চুন-সুড়কি,ইট ও টালির তৈরি এই স্থাপনাটির ছাদ দিয়ে চুইয়ে পড়ে বৃষ্টির পানি,দেয়ালে ধরেছে শ্যাওলা ও বড় বড় ফাটল। অযতেœ পড়ে থাকায় ভবনের ভেতরে এখন সাপ,ব্যাঙ,শেয়াল ও কুকুরের অবাধ বিচরণ।

এটি শুধু একটি স্থাপনার চিত্র নয়। জেলার মিয়ার দালান,শৈলকুপার ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ,নলডাঙ্গা রাজবাড়ি ও মন্দির,বারোবাজারের ঐতিহাসিক মসজিদ,কৃষক আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র ও গণিতবীদ কেপি বসুর বসতভিটাসহ  জেলার তালিকাভুক্ত ২১টি হেরিটেজ স্থাপনার অধিকাংশই আজ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মৃত্যুপথযাত্রী।

তালিকায় ২১টি স্থাপনা,বাস্তবে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ:

প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,জেলার ৬টি উপজেলায় এখন পর্যন্ত মোট ২১টি ঐতিহাসিক ও প্রতœসম্পদসমৃদ্ধ স্থাপনা হেরিটেজ তালিকাভুক্ত রয়েছে। কাগজে-কলমে এসব স্থাপনা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে,অধিকাংশ স্থাপনাই নেই কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার আওতায়। গেজেটভুক্ত হওয়া সত্তে¡ও বাস্তব সংরক্ষণ কার্যত অনুপস্থিত।শতবর্ষী এসব স্থাপনার অনেকগুলোই আজ সময়ের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। নিয়মিত সংস্কার,নিরাপত্তা বেষ্টনী,সাইনবোর্ড কিংবা পর্যবেক্ষক না থাকায় অনেক স্থাপনাই ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার পথে।

বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের দাবি-এখনই জরুরি পদক্ষেপ:

তারা বলছেন,শুধু গেজেট প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত জরিপ,দ্রæত সংস্কার পরিকল্পনা,পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে ঝিনাইদহ তার মূল্যবান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হারাতে পারে। এসব হেরিটেজ স্থাপনা শুধু অতীতের নিদর্শন নয়-এগুলো স্থানীয় পরিচয়,ইতিহাস ও সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ অবহেলা আর তদারকির অভাবে সেগুলো আজ নিঃশব্দে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তালিকাভুক্ত ২১টি স্থাপনাই ভবিষ্যতে কেবল নথির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে-বাস্তবে থাকবে না কোনো চিহ্ন। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়,তবে ঝিনাইদহের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শনগুলো অচিরেই হারিয়ে যাবে কালের গহŸরে-থেকে যাবে শুধু স্মৃতি আর আফসোস।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও হতাশা:

মহেশপুর উপজেলার রাসেল আহমেদ বলেন,‘তালিকাভুক্তির পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কার্যত থেমে যায়। কোনো কোনো স্থাপনা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে থাকায় সংরক্ষণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও স্থানীয় প্রশাসন,প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর ও ভ‚মি অফিসের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম শুরুই হয়নি।’

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, কেপিবসুর বসত ভিটা রক্ষাণাবেক্ষনের প্রশাসনের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য তেমন কোন ব্যবস্থা অদ্যবধি গ্রহণ করা হয়নি। এটি দর্শনীয় স্থান হওয়া সত্বেও রক্ষাণাবেক্ষনের অভাবে দিন দিন এটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ওলিয়ার রহমান বলেন, বারোবাজারের ঐতিহাসিক মসজিদগুলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোন তদারকি না করাই সেগুলো দিনদিন ধ্বংসের দারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে। সময় থাকতে প্রশাসন দৃষ্টি না দিলে পর্যায়ক্রমে ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যাবে।

শৈলকুপার ইলা মিত্র স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব সুজন বিপ্লব বলেন,‘ইতিহাসের সাক্ষী এসব স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার,নিয়মিত তদারকি ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন। শুধু গেজেটভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। না হলে অযতেœ এগুলো একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”

প্রশাসনের বক্তব্য

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসনেআরা বলেন, সদর উপজেলার হরিশংকরপুরে অবস্থিত কেপিবসুর বসত ভিটা রক্ষাণাবেক্ষনের জন্য ইতি মধ্যে জেলা পরিষদের কাছে একটি প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। আশা করি প্রকল্পটি পাস হলেই বাইন্ডারি প্রাচিরসহ বিল্ডিং মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। কযেকটি স্থান পরিদর্শন করেছি। পরবর্তীতে সেগুলো প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্কার করা হবে। 


শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহাফুজুর রহমান বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। আমি শুনেছি কৃষক আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের বসতবাড়ি আছে। সেটি সময় করে পরিদর্শন করবো। যদি সংস্কার করার প্রয়োজন হয় করবো।

মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার বলেন, উপজেলার খালিশপুরে অবস্থিত নীলকুঠি ভবনটি এক সময় ঔপনিবেশিক শাসনামলের সাক্ষী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে দাড়িয়ে আছে। এটি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানটি দর্শনীয় স্থান হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। 

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন,‘হেরিটেজ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে সংস্কার ও তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’


No comments

Powered by Blogger.