মসজিদ, শরাব ও খোদা: এক শতাব্দীর সেরা কাব্যিক বিতর্ক
সিফাত বিন সিদ্দিক স্টাফ রিপোর্টার:
উর্দু কবিতার ইতিহাসে কিছু বিতর্ক কালজয়ী হয়ে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম হলো মির্জা গালিব থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের কবি সাকি পর্যন্ত চলে আসা এই 'শরাব ও মসজিদ' কেন্দ্রিক কাব্যযুদ্ধ। যেখানে স্রষ্টার অস্তিত্ব আর মানুষের বিশ্বাসের সীমানা নিয়ে চলেছে তাত্ত্বিক লড়াই।
গালিবের সেই দুঃসাহসিক প্রশ্ন:-
ঘটনার শুরু মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিবকে দিয়ে। কিংবদন্তি আছে, গালিব একবার মসজিদে বসে মদ্যপান করছিলেন। মুসল্লিরা তাকে বাধা দিয়ে বললেন, "মসজিদ আল্লাহর ঘর, এখানে মদ্যপান হারাম।" তখন গালিব তার চিরচেনা দার্শনিক ভঙ্গিতে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন:
"শরাব পিনে দে মসজিদ মে ব্যায়ঠ কার, > ইয়া ও জাগা বাতা যাঁহা খুদা নেহি।" অর্থাৎ, আমাকে মসজিদে বসেই পান করতে দাও, নয়তো এমন কোনো জায়গার কথা বলো যেখানে খোদা নেই। গালিবের যুক্তি ছিল—স্রষ্টা যদি সর্বত্র বিরাজমান হন, তবে মসজিদ আর মসজিদের বাইরে তফাৎ কোথায়?
ইকবালের রক্ষণাত্মক জবাব:-
গালিবের মৃত্যুর বহু বছর পর বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল এর জবাব দেন। তিনি গালিবের আধ্যাত্মিক যুক্তিকে মেনে নিয়েও মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার তাগিদ দেন। ইকবাল লেখেন:
"ইয়া গালিব, মসজিদ খুদা কা ঘর হ্যায় পিনে কি জাগা নেহি, > কাফির কে দিলমে যা ওঁয়াহা খুদা নেহি।" ইকবালের মতে, খোদার ঘরে আদব রক্ষা করা জরুরি। যদি পান করতেই হয়, তবে অবিশ্বাসী বা কাফেরের হৃদয়ে গিয়ে করো, কারণ সেখানে খোদার বাস নেই।
আহমদ ফারাজের মানবিক দর্শন:-
ইকবালের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আধুনিক কবি আহমদ ফারাজ নিয়ে আসেন এক ভিন্ন মাত্রা। তিনি দাবি করেন, স্রষ্টা কেবল মুমিনের অন্তরেই নন, বরং সবার মাঝেই বিরাজমান। তিনি লিখলেন:
"কাফির কে দিল সে আয়া হু দেখ কার, > খুদা মওজুদ হ্যায় ওঁয়াহা উসসে পাতা নেহি।" ফারাজ বলতে চাইলেন, অবিশ্বাসী বা কাফেরের মনেও খোদা আছেন, কেবল সে নিজেই সেটা জানে না। ফলে সেখানেও পানের জায়গা নেই।
জান্নাতের ঠিকানা ও ওয়াসির সমাধান:-
এই তর্কের পিঠে কবি ওয়াসি মাসআলাগত এক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেন। দুনিয়ার সবখানেই যেহেতু খোদা আছেন, তাই দুনিয়াতে বিধিনিষেধ থাকবেই। তিনি বলেন:
"খুদা তো মওজুদ দুনিয়া মে হার জাগা, > তু জান্নাত মে যা ওঁয়াহা পিনে সে মানা নেহি।" ওয়াসি এখানে পরকালীন পুরস্কার 'শরাবান তহুরা'র কথা মনে করিয়ে দেন, যেখানে কোনো ধর্মীয় বাধা থাকবে না।
সাকির চূড়ান্ত তৃষ্ণা:-
দুঃখহীন জীবনে মদের কী কাজ?
সবশেষে এই দীর্ঘ বিতর্কে সাকি যোগ করেন এক মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা। তিনি প্রশ্ন তোলেন মদ্যপানের উদ্দেশ্য নিয়ে:
"পীতা হুঁ সাকি গাম-এ-দুনিয়া ভুলানে কে লিয়ে, > জান্নাত মে কৌন সা গাম হ্যায়, ইস লিয়ে ওঁয়াহা মাজা নেহি।" সাকির যুক্তি হলো, মানুষ মদ্যপান করে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট ভুলতে। কিন্তু জান্নাতে তো কোনো দুঃখই নেই, তাহলে সেখানে মদ্যপানের সার্থকতা কোথায়?
শতাব্দী প্রাচীন এই কাব্যিক আদান-প্রদান আসলে স্রষ্টার প্রতি মানুষের ভালোবাসা, ভয় এবং অধিকারবোধের বহিঃপ্রকাশ। গালিবের বিদ্রোহ থেকে সাকির বাস্তবতা—উর্দু কবিতার এই যাত্রা আজও পাঠকদের ভাবিয়ে তোলে।

No comments