কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভ্যাকসিন নেই, বরাদ্দের টাকা নিয়েও রহস্য

 

রবিউল ইসলাম  স্টাফ  রিপোর্টার :
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কুকুরে কামড়ানো রোগীদের জন্য অত্যন্ত জরুরী জলাতঙ্ক (রেবিস) প্রতিষেধক ভ্যাকসিন দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য সরকারি বরাদ্দ হিসেবে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে প্রায় দুই মাস আগে। বরাদ্দের অর্থ গ্রহণ করা হলেও এখনো ভ্যাকসিন কেনা হয়নি। এতে একদিকে যেমন রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে বরাদ্দের অর্থের ব্যবহার নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও রহস্য।
সরেজমিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, গত তিন থেকে চার মাস ধরে হাসপাতালটিতে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক ভ্যাকসিন সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। প্রতিদিন কুকুরে কামড়ানো রোগীরা হাসপাতালে এসে ভ্যাকসিন না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে বেশি দামে বেসরকারি হাসপাতাল বা ফার্মেসি থেকে ভ্যাকসিন কিনছেন, যা দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, উপজেলা পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিবি) তহবিল থেকে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন কেনার জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের অর্থ থেকে ভ্যাট ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার টাকার একটি চেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই অর্থ দিয়ে ভ্যাকসিন কেনার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পরিকল্পিতভাবে ভ্যাকসিন ক্রয় বিলম্বিত করে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হতে পারে।
উপজেলার পৌর এলাকার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা রোমেজা খাতুন জানান, তার বয়স্ক শাশুড়িকে কুকুরে কামড়ানোর পর কয়েকবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হলেও সেখানে কোনো ভ্যাকসিন পাওয়া যায়নি। পরে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে উচ্চমূল্যে ভ্যাকসিন কিনতে হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকায় আমাদের মতো গরিব মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন স্থানীয় সাংবাদিক আরিফ মোল্লা। তিনি বলেন, আমার মেয়েকে কুকুরে কামড়ানোর পর হাসপাতালে কয়েকবার গিয়েছি। কিন্তু ভ্যাকসিন না থাকায় শেষ পর্যন্ত বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন না থাকা খুবই দুঃখজনক।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় প্রতিদিনই কুকুরে কামড়ানো রোগীরা হাসপাতালে এসে ভ্যাকসিন না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। বিশেষ করে জলাতঙ্ক একটি প্রাণঘাতী রোগ হওয়ায় দ্রুত প্রতিষেধক গ্রহণ না করলে জীবনহানির ঝুঁকি থাকে। এ অবস্থায় হাসপাতালের এমন অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. অরুন কুমার বলেন, আমি সম্প্রতি এখানে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আগের কর্মকর্তার সময় ভ্যাকসিন কেনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে এখনো ভ্যাকসিন কেনা হয়নি। বরাদ্দের টাকা হাসপাতালের হিসাবেই সংরক্ষিত রয়েছে। ভ্যাকসিনের মূল্য বেশি হওয়ায় এবং কিছু প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে ক্রয়ে বিলম্ব হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ভ্যাকসিন কেনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কেনা হয়নি, বিষয়টি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হবে। কেন ভ্যাকসিন কেনা হয়নি এবং বরাদ্দের অর্থের বর্তমান অবস্থা কী তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে দ্রুত ভ্যাকসিন প্রদান অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো ভ্যাকসিন গ্রহণ না করলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দ্রæত ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে ভ্যাকসিন সংকট নিরসন এবং বরাদ্দের অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে এবং সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে না

No comments

Powered by Blogger.