ঝিনাইদহে বৈরী আবহাওয়ায় কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ।


 ঝিনাইদহ প্রতিনিধি 
ঝিনাইদহের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন পাকা বোরো ধানের সোনালি সমারোহ। বাতাসে দুলছে ধানের শীষ, কৃষকের চোখে ছিল স্বপ্ন আর স্বস্তির আলো। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে এখন বাড়ছে উৎকণ্ঠা। কয়েক মাসের শ্রম, সেচ সংকট, সার সংকট ও বাড়তি উৎপাদন খরচ সামলে যে ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায় ছিলেন কৃষক, ঠিক সেই সময় টানা বৈরী আবহাওয়া তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তুলেছে।

গত তিন দিনের লাগাতার কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন এলাকার পাকা ধান এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মাঠে পড়ে থাকা ধান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। অনেকে দিন-রাত কাটাচ্ছেন আতঙ্কে, কখন আবার ঝড়-বৃষ্টি এসে সব পরিশ্রম ভাসিয়ে নেয়।

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯০ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এবার আবাদ হয়েছে ৯০ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬ মেট্রিক টন।

তবে মৌসুমের শেষ সময়ে এসে আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতি কৃষকের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-এ-নবী বলেন, এবার ধানের ফলন খুবই ভালো হয়েছে। কিন্তু শেষ সময়ে টানা বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জেলায় ১৫ হাজার ৮০১ হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে, যা মোট আবাদি জমির মাত্র ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ এখনো প্রায় ৮৩ শতাংশ ধান মাঠে রয়েছে।

সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক জহিরুল  ইসলাম বলেন, “গাড়ামারা, রামচন্দ্রপুর পূর্বপাড়া, বড় খোলারদাঁড়ি, খইলশেকুঁড়ো, সোনারদাইড়, শালিয়া, রতনপুর, জিয়ালা ও বেজিমারা মাঠে এখনো অসংখ্য বিঘা জমির ধান কাটা হয়নি। আবহাওয়ার যে অবস্থা, তাতে পাকা ধান ঘরে তুলতে না পারলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

অন্যদিকে মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলার কয়েকটি মাঠে টানা বৃষ্টির পানিতে পাকা ধান ডুবে থাকতে দেখা গেছে। এতে কৃষকদের মধ্যে হতাশা আরও বেড়েছে।

মহেশপুর উপজেলার নোয়ানীপাড়া গ্রামের কৃষক মফিজ  মাতব্বর বলেন, সারা বছর কষ্ট করে চাষ করেছি। এখন ধান ঘরে তোলার সময় এমন ঝড়-বৃষ্টি আমাদের অসহায় করে তুলেছে। বৃষ্টির কারণে ধান কাটতে পারছি না, আবার পানিতে পড়ে থাকলে নষ্ট হওয়ার ভয় আছে।

কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের পাঁচলিয়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর  হোসেন বলেন, একদিকে মাঠে পাকা ধান, অন্যদিকে ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাত। শ্রমিক সংকটও তীব্র। সব মিলিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। এখন আল্লাহর রহমত ছাড়া আর কোনো ভরসা নেই।

তবে কৃষকদের হতাশার মধ্যেও আশার কথা শুনিয়েছেন ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ধানের ফলন প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে। যেসব জমির ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ঘরে তোলার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জেলার সব উপজেলা কৃষি অফিস সার্বক্ষণিকভাবে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আবহাওয়ার পরিস্থিতি বড় ধরনের দুর্যোগে রূপ না নিলে কৃষকরা নিরাপদে ফসল ঘরে তুলতে পারবেন। আশা করছি, এবার চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যাবে।


No comments

Powered by Blogger.