বারোবাজারে ২১ বছর ধরে পরিত্যক্ত ইউপি ভবনে, ১৭ বছর ধরে চলছে গ্রাম পুলিশের মুরগির ব্যবসা




রবিউল ইসলাম,স্টাফ রিপোর্টার, 
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ৯নং বারোবাজারের পুরাতন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার দুই দশকেরও বেশি সময় পার হলেও এখনো তা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটি দীর্ঘ ২১ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও সেখানে এখনো নির্বিঘেœ ব্যবসা চলছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় ভবনটি ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

জানা গেছে, ষাটের দশকে  বারোবাজার-হাকিমপুর সড়কের পাশে বাজারের মধ্যেই ওই ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি নির্মাণ করা হয়, যেখানে নিচের তলায় ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করা হতো এবং দ্বিতীয় তলায়  পুলিশ ফাঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করা হতো। পরে ১৯৮৮ সালে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রঞ্জুর নিকট থেকে ২০০৪ সালে আবুল কালাম আজাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে মাহবুবুর রহমান রঞ্জুর নিকট থেকে দায়িত্ব এবং ওই পুরাতন ভবনটি বুঝে নেন।  

পরবর্তীতে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে ২০০৪ সালে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদের সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এরপর তিনি বারোবাজার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি অস্থায়ী কার্যালয় থেকে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ২০০৫ সালে সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বাদুরগাছা সড়কের পাশে পারিবারিকভাবে জমি দান করার পর সেখানে নতুন আধুনিক ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণ করা হয় এবং ওই সময়ে সেখানে পরিষদের কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয়।

কিন্তু পরিত্যক্ত ঘোষণার পরও পুরাতন ভবনটি আজও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ জামিরুল ইসলাম কোন নিয়মনীতি ছাড়াই প্রায় ১৭ বছর ধরে ভবনটির একটি অংশে পোল্ট্রি মুরগির ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বাকী অংশ তারই চাচাতো ভাইদের দিয়ে ব্যবস্যা করাচ্ছেন। এ বিষয়ে কোনো বৈধ বরাদ্দ বা অনুমতির কাগজপত্র দেখাতে না পারলেও তিনি দাবি করেন, আমি মাঝেমধ্যে কিছু টাকা পরিশোধ করি। পরবর্তিতে বিষয়টির বিস্তারিত জানতে দখলদার গ্রাম পুলিশ জামিরুলের ০১৭২৫০৮১৩৬৫ নম্বর মুঠো ফোনে একাধিকবার কল করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।  

স্থানীয় সূত্র জানায়, ভবনটি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ছেড়ে দিতে একাধিকবার বলা হলেও তিনি তা মানছেন না। প্রভাবশালী মহলের মদদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বারোবাজার ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ও কালীগঞ্জ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসান সাজ্জাদ বলেন, পুরাতন ভবনটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানে একটি আধুনিক মার্কেট নির্মাণ করে দোকান ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সরকারি রাজস্ব আয় হয়। কিন্তু বর্তমানে সেখানে গ্রাম পুলিশ জামিরুল ইসলাম প্রায় ১৭ বছর ধরে পোল্ট্রি মুরগির ব্যবসা করছেন। তাকে একাধিকবার ভবনটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে বলা হয়েছে এবং কয়েকবার লিখিত নোটিশও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি কোনো কর্ণপাত করছেন না। সরেজমিনে ব্যবস্থা নিতে গেলে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বাধা দেন।

বারোবাজার ইউনিয়নের পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০০৪ সালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তখন আমি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ওই ভবন ছেড়ে দিয়ে অস্থায়ী কার্যালয়ে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করি। পরে ২০০৫ সালে আমাদের পরিবারের দান করা জমিতে বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মিত হয়।

তিনি আরও বলেন, পরিত্যক্ত ভবনের সামনে ও ভেতরে ব্যবসা-বাণিজ্য হওয়ায় সেখানে প্রতিদিন মানুষের ভিড় থাকে। ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। আল্লাহ না করুন, যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে অনেক নিরীহ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রæত ভবনটি ঘিরে বাউন্ডারি দিয়ে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা এবং সেখানে নতুন একটি ভবন নির্মাণ করে নিয়ম অনুযায়ী দোকান বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। সরকারি সম্পত্তি প্রভাব খাটিয়ে দখল করে ব্যবসা করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ভবনটি নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কাছে অনুমোদনের জন্য আবেদন করে অনুমতি সাপেক্ষে ভবনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ এবং প্রবেশ নিষেধ সাইনবোর্ড টানানো হবে। পাশাপাশি সেখানে একটি আধুনিক ভবন নির্মাণের বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা ভবনটি দ্রæত অপসারণ বা নিরাপদভাবে ঘিরে ফেলা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্রশাসনের দ্রæত ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

No comments

Powered by Blogger.