কালীগঞ্জে সেই প্রধান শিক্ষককে ঘিরে ফের বিতর্ক, এবার নথি হস্তান্তর না করার অভিযোগ

 

রবিউল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার :
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক চিত্তরঞ্জন পালকে ঘিরে বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। অতীতে বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণ নিয়ে একাধিক অভিযোগে আলোচনায় আসা এই শিক্ষক এবার অবসর গ্রহণের পরও বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, আর্থিক হিসাব-নিকাশ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আগের অভিযোগগুলোর পর নতুন এই পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুদ্দীন গত ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন ইউএনও। তবে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, এখনো সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি।
অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, চাকরির নির্ধারিত বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় চিত্তরঞ্জন পাল গত ৩০ সেপ্টেম্বর অবসর গ্রহণ করেন। নিয়ম অনুযায়ী অবসরের পর বিদ্যালয়ের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, আর্থিক হিসাব-নিকাশ, রেজিস্টার, আলমারির চাবি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, অবসরের পরও তিনি এসব নথিপত্র ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি। এতে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী। বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

চিত্তরঞ্জন পালকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিজের কাছে রাখা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টির একাধিক অভিযোগের কথা উঠে এসেছিল।
ওই সময়কার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যালয়ের ৯১ হাজার ৩০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। এর আগে ২০১৪ ও ২০১৫ সালেও বিদ্যালয়ের ৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুই দফা বরখাস্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। পরে বিদ্যালয়ের তহবিলে ২ লাখ ৬১ হাজার টাকা জমা দিয়ে এবং কয়েকটি শর্তে অঙ্গীকারনামা দেওয়ার পর তিনি চাকরিতে ফিরে পান।

এ ছাড়া বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির ১৩টি রেজুলেশন খাতা, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার হিসাবসংক্রান্ত খাতা, শিক্ষার্থীদের সনদ, নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র, জমির দলিল ও ক্যাশ বই নিজের কাছে রাখার অভিযোগও সে সময় প্রকাশিত হয়েছিল। বিদ্যালয়ের ব্যবহৃত মুঠোফোনের সিম নিজের কাছে রাখার অভিযোগ নিয়েও তখন জটিলতা তৈরি হয়েছিল।

বর্তমান অভিযোগকারী সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুদ্দীন বলেন, বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও প্রশাসনিক দায়িত্ব যথাসময়ে হস্তান্তর না করায় প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েও তাঁরা এখনো সমস্যার সমাধান পাননি বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযোগপত্রের অনুলিপি ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, কালীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির কাছেও পাঠানো হয়েছে। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, হিসাব-নিকাশ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, গোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লিখিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) গিয়াস উদ্দিন বলেন, সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইউএনওর কাছে দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। বিষয়টি বেশ জটিল। স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে ওই প্রধান শিক্ষকের পূর্ববিরোধ রয়েছে এবং এসব বিষয় নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগও করা হয়েছে বলে তিনি জানান। কেন তিনি বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছেন না, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক চিত্তরঞ্জন পালের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও আর্থিক হিসাব-নিকাশ হস্তান্তরের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। দীর্ঘদিনের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, নথিপত্রের হিসাব যাচাই এবং দায়িত্ব হস্তান্তর নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


No comments

Powered by Blogger.