ভোটের মাঠে দুই মেরু: সংস্কার বনাম ইনসাফের লড়াইয়ে বিএনপি ও জামায়াত
সিফাত বিন সিদ্দিক স্টাফ রিপোর্টার:
সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মাইকের আওয়াজ আর স্লোগানে মুখর গ্রাম-গঞ্জ ও শহর। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে সারা দেশে এখন উৎসবের আমেজ, তবে এই উৎসবের আবহে মিশে আছে টানটান উত্তেজনা। গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনি ক্যাম্প ভাঙচুর ও সমর্থকদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও প্রার্থীরা দমে যাননি। বিশেষ করে দেশের অন্যতম প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি ও ইশতেহারের পসরা সাজিয়ে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন। দুই দলের ইশতেহারেই রয়েছে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার আকাঙ্ক্ষা, তবে তাদের কর্মপন্থা ও কৌশলে ফুটে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন ধারার আমেজ।
বিএনপি জোটের প্রচারণার মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের ঘোষিত ‘কার্ড’ ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা পরিকল্পনা। প্রার্থীরা ভোটারদের আশ্বস্ত করছেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের নারী সদস্যের নামে সরাসরি মাসিক নগদ ভাতা এবং সুলভ মূল্যে নিত্যপণ্যের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। কৃষকদের জন্য দলটি নিয়ে এসেছে ‘কৃষক কার্ড’ বা ‘এগ্রো কার্ড’, যা দিয়ে সার, বীজ ও কীটনাশক সংগ্রহে সরাসরি ভর্তুকি পাবেন চাষিরা। এছাড়া রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফাকে সামনে রেখে বিএনপি প্রার্থীরা বলছেন ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা। একজন ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না এবং দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন করা হবে—এমন সব বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারা ভোটারদের দ্বারে যাচ্ছেন। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত ‘বেকার ভাতা’ প্রদানের বিষয়টিও তাদের প্রচারণায় বিশেষ গতি সঞ্চার করেছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনি লড়াইকে দেখছে একটি ‘ইনসাফভিত্তিক’ সমাজ গড়ার সংগ্রাম হিসেবে। তাদের প্রচারণার প্রধান সুর হলো দুর্নীতিমুক্ত ও নীতিবান প্রশাসন। জামায়াত নেতারা প্রতিটি জনসভায় অঙ্গীকার করছেন যে, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্সে আনা হবে। তাদের ইশতেহারে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ের ওপর। তরুণ প্রজন্মের জন্য তারা কেবল চাকরির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না, বরং বিনা সুদে বা সহজ শর্তে বিনিয়োগ সুবিধা দিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। এছাড়া বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণের নাগালে আনা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা জামায়াতের ইশতেহারে ভোটারদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে। একটি বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে জাকাত ও দানভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কথাও তারা জোরালোভাবে বলছেন।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের ভোটাররা কেবল স্লোগানে তুষ্ট নন, তারা প্রতিটি প্রতিশ্রুতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সুশাসনের অভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ রয়েছে, বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই তা পুঁজি করার চেষ্টা করছে। একদিকে বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কার ও ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি সুফল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে জামায়াতের দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার—এই দুইয়ের মাঝে ভোটাররা এখন সঠিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিচ্ছিন্ন সহিংসতা সত্ত্বেও নির্বাচনি আমেজ এখনো বজায় রয়েছে এবং তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
১২ই ফেব্রুয়ারির সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য এখন পুরো দেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। পোস্টারের সাদা-কালো মিছিল আর স্লোগানের গগণবিদারী চিৎকারের আড়ালে ভোটাররা আসলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার সন্ধান করছেন। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত ব্যালট যুদ্ধে কার প্রতিশ্রুতি ভোটারদের হৃদয় জয় করে আর কার কপালে জোটে বিজয়ের তিলক। তবে সব ছাপিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, যেখানে তাদের প্রতিটি ভোটের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে।

No comments