বিশ্বকাপে অনিশ্চিত বাংলাদেশ; পাকিস্তানের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি স্থগিত
সিফাত বিন সিদ্দিক স্টাফ রিপোর্টার:
আসন্ন ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি, অথচ বিশ্ব ক্রিকেটের আকাশে এখন কালো মেঘের ঘনঘটা। টুর্নামেন্টের অন্যতম আয়োজক ভারতের মাটিতে খেলতে যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দীর্ঘ টালবাহানার পর বিসিবির এই অনড় অবস্থানে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)।
ভারতের মাটিতে খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই—এমন দাবি তুলে বাংলাদেশ দল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো অবস্থাতেই ভারতীয় সীমানায় পা রাখবে না। এই উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের নিরাপত্তা শঙ্কাকে 'যৌক্তিক' আখ্যা দিয়ে এবং ভ্রাতৃপ্রতিম দেশটির প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) তাদের চলমান বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ক্যাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে। এতে করে বিশ্বকাপের মূল আসর নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সাম্প্রতিক কিছু কূটনৈতিক টানাপোড়েন। বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের প্রতি বৈরী আচরণ এবং একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে নিরাপত্তার অজুহাতে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে রিলিজ করে দেওয়ার ঘটনা বিসিবিকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। বোর্ড কর্মকর্তাদের মতে, যেখানে একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, সেখানে পুরো জাতীয় দলকে অনিরাপদ পরিবেশে ঠেলে দেওয়া সম্ভব নয়। বিসিবি ইতোমধ্যে আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিয়েছে যে, ভারতের মাটিতে নির্ধারিত তাদের সব ম্যাচ যেন সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, তারা বিশ্বকাপ খেলতে প্রস্তুত, কিন্তু তা কোনোভাবেই ভারতের মাটিতে নয়।
এদিকে বাংলাদেশের এই অনড় অবস্থানকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। পিসিবির পক্ষ থেকে এক জরুরি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের উত্থাপিত নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। পাকিস্তান মনে করে, যেকোনো আন্তর্জাতিক আসরে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা সবার আগে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের জাতীয় দলের পূর্বনির্ধারিত অনুশীলন এবং বিশ্বকাপ কেন্দ্রিক সব ধরনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। পিসিবি সূত্র আরও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, যদি বাংলাদেশের সমস্যার সম্মানজনক সমাধান না হয় এবং আইসিসি তাদের দাবি বিবেচনা না করে, তবে পাকিস্তানও এই আসরে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো বড় দুটি দলের অংশগ্রহণ নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তা আইসিসিকে বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক চাপে ফেলেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আইসিসির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বর্তমানে ঢাকা সফর করছে। তারা বিসিবি ও সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করলেও এখন পর্যন্ত কোনো রফাসূত্র মেলেনি। আইসিসি সূচি পরিবর্তনের জটিলতা এবং লজিস্টিক সমস্যার কথা বললেও বাংলাদেশ তাদের অবস্থানে বিন্দুমাত্র নমনীয়তা দেখায়নি। বিসিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গ্রুপ পর্যায়ে আয়ারল্যান্ডের সাথে স্থান পরিবর্তন করে তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর করা হোক। এই অচলাবস্থা নিরসনে আগামী ২১ জানুয়ারি একটি চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেদিনের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে ২০২৬ বিশ্বকাপের ভাগ্য। ক্রিকেট প্রেমীরা এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছেন সেই দিনের দিকে, কারণ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের এই কঠোর অবস্থান বিশ্ব ক্রিকেটের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
চিত্রা নিউজ ২৪

No comments