সিফাত বিন সিদ্দিক:
ঢাকা ১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে ভানুয়াতু প্রজাতন্ত্রের নাগরিকত্ব ও সেখানে অবৈধ সম্পদ গোপন করার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু ড. এম এ কাইয়ুম এ বিষয় সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। সেই সময় থেকে এই দেশটি বাংলাদেশে গুগল ট্রেন্ডিং এ উঠে এসেছে। আমরা এখন এই অপরিচিত দেশের সাথে পরিচিত হব।
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশির বুক চিরে জেগে ওঠা এক বিস্ময়কর ভূখণ্ড হলো ভানুয়াতু প্রজাতন্ত্র। প্রায় ৮০টি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এই দেশটি তার আদিম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব দিকে এবং ফিজির পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটি আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া পেলেও আজও তার হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যকে সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছে। ভানুয়াতুর প্রতিটি দ্বীপ যেন এক একটি জীবন্ত জাদুঘর, যেখানে আগ্নেয়গিরির উত্তাপ আর সমুদ্রের শীতলতা একীভূত হয়েছে।
ভানুয়াতুর ভৌগোলিক গঠন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং রোমাঞ্চকর। এটি মূলত একটি আগ্নেয়গিরি থেকে সৃষ্ট দ্বীপপুঞ্জ, যার ফলে এখানকার ভূপ্রকৃতি পাহাড়ি এবং বনভূমি দ্বারা আবৃত। এই দ্বীপপুঞ্জের অনেকগুলো দ্বীপে আজও সক্রিয় আগ্নেয়গিরি দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে তানা দ্বীপের মাউন্ট ইয়াসুর সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে এক প্রধান আকর্ষণ, কারণ এটি বিশ্বের অন্যতম সহজলভ্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। এই আগ্নেয়গিরিগুলো একদিকে যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করে, অন্যদিকে এর ছাই মাটির উর্বরতা বাড়িয়ে কৃষিকাজে ব্যাপক সহায়তা করে।
দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ ব্যতিক্রমী এবং কৌতূহলোদ্দীপক। দীর্ঘকাল ধরে এখানে মেলানেশীয় জনগোষ্ঠীর আধিপত্য ছিল। পরবর্তীতে আঠারো শতকে ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা এখানে আসতে শুরু করলে এটি ব্রিটিশ এবং ফরাসিদের নজরে আসে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯০৬ সালে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স মিলে এক অদ্ভুত চুক্তির মাধ্যমে এই দেশটি যৌথভাবে শাসন করতে শুরু করে। ইতিহাসে এটি 'অ্যাংলো-ফ্রেঞ্চ কনডমিনিয়াম' নামে পরিচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সংগ্রামের পর ১৯৮০ সালের ৩০ জুলাই দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে এবং 'নিউ হেব্রাইডস' নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করা হয় 'ভানুয়াতু'।
ভানুয়াতুর অর্থনীতি মূলত কৃষি, পর্যটন এবং অফশোর আর্থিক পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল। দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষিকাজের সাথে যুক্ত। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কোপরা, কাকাও এবং কফি চাষ প্রধান ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে 'কাভা' নামক ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদটি দেশটির প্রধান রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাভার ঔষধি গুণের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভানুয়াতুর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে। পাশাপাশি সমুদ্র সম্পদ ও মৎস্য আহরণ দেশটির আয়ের অন্যতম উৎস। পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে দেশটির অবকাঠামো গড়ে উঠেছে এবং প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এই খাত থেকে অর্জিত হয়।
ভানুয়াতুর অর্থনীতির একটি বিশেষ ও শক্তিশালী স্তম্ভ হলো তাদের 'নাগরিকত্ব বিনিয়োগ কর্মসূচি' (Citizenship by Investment Program)। এটি মূলত 'ডেভেলপমেন্ট সাপোর্ট প্রোগ্রাম' (DSP) এবং 'ভানুয়াতু কন্ট্রিবিউশন প্রোগ্রাম' (VCP) নামে পরিচিত। এই কর্মসূচির আওতায় বিদেশি নাগরিকরা ভানুয়াতুর জাতীয় তহবিলে নির্দিষ্ট অংকের অর্থ (সাধারণত ১ লক্ষ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে শুরু) অনুদান দেওয়ার বিনিময়ে দেশটির নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট লাভ করতে পারেন। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত এবং বিশ্বের অন্যতম সহজলভ্য নাগরিকত্ব কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃত। এই খাত থেকে প্রাপ্ত অর্থ দেশটির জাতীয় উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্গঠন এবং সরকারি ঋণের বোঝা কমাতে সরাসরি ব্যয় করা হয়। তবে এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিশ্বের বহু দেশে ভিসা-মুক্ত যাতায়াতের সুবিধা থাকায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভানুয়াতু গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটির শিক্ষা কাঠামো মূলত প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা—এই তিন স্তরে বিভক্ত। যেহেতু দেশটি এক সময় ব্রিটিশ ও ফরাসিদের যৌথ শাসনে ছিল, তাই এখানে আজও ইংরেজি এবং ফরাসি উভয় মাধ্যমেই পাঠদান প্রচলিত রয়েছে। সরকার প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং সর্বজনীন করার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে দুর্গম দ্বীপগুলোতে উন্নত শিক্ষা সরঞ্জাম এবং দক্ষ শিক্ষক পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চশিক্ষার জন্য পোর্ট ভিলায় 'ইউনিভার্সিটি অব দ্য সাউথ প্যাসিফিক'-এর একটি ক্যাম্পাস রয়েছে, যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। কারিগরি শিক্ষার প্রসারেও দেশটির সরকার বর্তমানে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে যাতে যুব সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা যায়।
ভানুয়াতুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। জনসংখ্যার অনুপাতে ভাষার ঘনত্বের দিক থেকে এটি বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে। দেশটির প্রধান তিনটি দাপ্তরিক ভাষা হলো ইংরেজি, ফরাসি এবং বিসলামা। বিসলামা মূলত একটি মিশ্র বা ক্রেওল ভাষা, যা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও এই ছোট দেশটিতে শতাধিক স্থানীয় উপভাষা প্রচলিত রয়েছে। এখানকার আদিবাসীদের 'নি-ভানুয়াতু' বলা হয়, যারা আজও তাদের প্রাচীন সামাজিক প্রথা বা 'কাসটম' কঠোরভাবে মেনে চলে। সামাজিকভাবে ভানুয়াতুর মানুষ অত্যন্ত সহজ-সরল এবং অতিথিপরায়ণ। পেন্টেকোস্ট দ্বীপে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত 'ল্যান্ড ডাইভিং' বা লতা দিয়ে পা বেঁধে উঁচু টাওয়ার থেকে ঝাঁপ দেওয়ার দৃশ্য দেখলে আজও রোমাঞ্চ অনুভব হয়।
তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে ভানুয়াতু বর্তমানে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির নিচু দ্বীপগুলো তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি প্রায়শই প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প এবং সুনামির কবলে পড়ে। পরিবেশগত এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা বর্তমানে দেশটির সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তা সত্ত্বেও এখানকার মানুষ অত্যন্ত সহনশীল এবং হাসিখুশি, যার ফলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপে ভানুয়াতু বারবার বিশ্বের অন্যতম 'সুখী দেশ' হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আধুনিক বিশ্বের যান্ত্রিকতার মাঝে ভানুয়াতু আজও তার প্রাকৃতিক সম্পদ আর মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে টিকে আছে।
No comments